হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, কুমারপুর, মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত: পবিত্র ফাতেমিয়া দিবস তথা হজরত ফাতেমা জাহরা (সা.আ.)-এর শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার কুমারপুর গ্রামে এক ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ মজলিসের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় ধর্মপ্রাণ আজাদার ও জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই মজলিসে শ্রদ্ধা ও ভক্তির পরিবেশ বিরাজ করে।
মজলিসে বক্তব্য রাখেন হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা মুনির আব্বাস নাজাফি। তিনি তাঁর বক্তব্যে হজরত ফাতেমা জাহরা (সা.আ.)-এর শাহাদাত ও ত্যাগ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন। তিনি ইসলামের ইতিহাসে হজরত ফাতেমা জাহরা (সা.আ.)-এর মহান ত্যাগ, ধৈর্য, চরিত্রের মহত্ত্ব ও আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্যের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এবং উপস্থিত সকলকে তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।
তিনি শাহাদাতের কারণ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করতে করতে গিয়ে বলেন, শিয়া মত অনুসারে, হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.আ.)-এর শাহাদাতের মূল কারণ ছিল রাসূল (সা.)-এর ওফাতের পর খিলাফতের বিরোধের সময়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। তৎকালীন কিছু সাহাবা হযরত আলী (আ.)-কে বাইয়াত করতে বাধ্য করার জন্য তাঁর ঘরে হামলা চালান, এই হামলায় হযরত ফাতিমা (সা.আ.) গুরুতর আহত হন এবং তাঁর গর্ভস্থ সন্তান মুহসিন (আ.) ক্ষতিগ্রস্ত হন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর শাহাদাতে পরিণত হয়।
মাওলানা মুনির আব্বাস বলেন, শাহাদাতের মূল কারণ হলো খিলাফত নিয়ে বিতর্ক ও ঘরে হামলা। রাসূল (সা.)-এর ওফাতের পর, সাকিফায় আবু বকরকে খলিফা হিসেবে নির্বাচন করা হয়, কিন্তু হযরত আলী (আ.) এবং আরও কিছু সাহাবা তখনও বাইয়াত করেননি। শিয়া সূত্রের রেওয়ায়েত অনুসারে, বাইয়াত আদায়ের জন্য উমর ইবনে খাত্তাবের নেতৃত্বে একটি দল হযরত আলী (আ.)-এর বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। এই সংঘর্ষের সময়, দরজায় আঘাত ও চাপের কারণে হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর পাঁজরে আঘাত লাগে এবং তাঁর গর্ভস্থ পুত্র মুহসিনের গর্ভপাত ঘটে। এই আঘাত ও তার পরবর্তী জটিলতাই তাঁর শাহাদাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি আরোও বলেন, হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর উপর এই অত্যাচারের পিছনে আরও গভীর কারণ ছিল, তা হলো তিনি দৃঢ়ভাবে হযরত আলী (আ.)-এর ইমামত ও খিলাফতের অধিকার রক্ষা করেছিলেন। তিনি "ফাদাকের খুতবা" (ফাদাকখুতবা) প্রভৃতির মাধ্যমে প্রকাশ্যে তৎকালীন শাসকদের অবিচার ও ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে কথা বলেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁকে চুপ করিয়ে দেওয়া এবং বৈধ খিলাফত প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রভাব দূর করার জন্যই তিনি অত্যাচারের শিকার হন।
মাওলানা মুনির আব্বাস নাজাফি বলেন, এই বিষয়ে শিয়া ও সুন্নি মতের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। শিয়া মত অনুসারে, হযরত ফাতিমা (সা.আ.) স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেননি, বরং "শাহাদাত" বরণ করেছেন। প্রমাণ হিসেবে ইমাম কাজিম (আ.)-এর বাণী উল্লেখ করা হয়, যেখানে তাঁকে "সিদ্দিকা শহীদা" (সত্যবাদিনী শহীদা) বলা হয়েছে। অন্যদিকে সুন্নি মত অনুসারে, সাধারণত মনে করা হয় যে তিনি রাসূল (সা.)-এর বিয়োগের শোকে অসুস্থ হয়ে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন।
শেষে তিনি বলেন, সহজভাবে বলতে গেলে, শিয়া দৃষ্টিকোণ থেকে, হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.আ.)-এর শাহাদাত একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। রাসূল (সা.)-এর ওফাতের পর খিলাফতের ক্ষমতা হস্তান্তরের সংকটকালে, হযরত আলী (আ.)-এর প্রতি তাঁর অটল সমর্থনের কারণে, তিনি ক্ষমতা দখলকারীদের অত্যাচারের শিকার হন এবং শেষ পর্যন্ত শহীদ হন।
মজলিস শেষে উপস্থিত সকলের জন্য বিশেষ মোনাজাত ও দোয়ার আয়োজন করা হয়।
আপনার কমেন্ট